ART- অভিনয়ের স্থান (space) নিয়ে একটি পরীক্ষামূলক নাট্যপ্রয়াস

Posted by Kaahon Desk On May 26, 2018

কলকাতা প্র্যাক্সিস নাট্যদলের নির্দেশক গৌতম সরকার থিয়েটারের স্থান (space) নিয়ে এক নতুন ধরণের পরীক্ষামূলক প্রয়াস করলেন। একই নাটক তিনি প্রথমে অন্তরঙ্গ থিয়েটারের আঙ্গিকে, এবং পরে প্রসেনিয়াম রীতি মেনে মঞ্চে উপস্থাপনা করলেন। ভিন্ন স্থানেও ভিন্ন রীতিতে একই নাটককে দর্শকদের সামনে অভিনয় করে মূলত প্রশ্ন তুলতে চাইলেন যে, দুটি উপস্থাপনার মধ্যে অর্থগত বা দৃষ্টিভঙ্গীর কোন ফারাক ঘটল কি? থিয়েটারের space নিয়ে এই ধরণের পরীক্ষামূলক কাজ বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে বেশ অভিনব এবং প্রয়োজনীয়। গৌতম বেছে নিয়েছেন বিখ্যাত ফরাসী লেখক ইয়াসমিনা রেজার মূল নাটক ‘Art’-এর ক্রিস্টোফার হ্যাম্পটনকৃত ইংরেজী আনুবাদ। হ্যাম্পটনের অনুবাদ থেকে ঈপ্সিতা দেবনাথ এবং গৌতম সরকার বাংলায় নাটকটি রচনা করেছেন। Art নাটকটি পৃথিবীর বহুজায়গায় অভিনীত হয়েছে এবং বহুভাষায় অনুদিত হয়েছে, তবে বাংলা ভাষায় সম্ভবত এটি প্রথম কাজ। নাটকের text’টি অত্যন্ত ভালো, সমসাময়িক এবং নাটকের মূলভাবটি অক্ষুন্ন রেখে চমৎকার বঙ্গীকরণ করা হয়েছে।

গত ১২ ও ১৩ই মে একাডেমি অফফাইন আর্টসের নর্থ গ্যালারীতে এবং ১৮ই মে একাডেমি মূলমঞ্চে নাটকটি অভিনীত হল। নাটকের বিষয় যেহেতু আর্ট তাই আর্ট গ্যালারীর স্পেসে উপস্থাপনার ভাবনা।অভিনয় করেছেন এই সময়ের দুই শক্তিশালী অভিনেতা অর্নিবান চক্রবর্তী ও সত্রাজিত সরকার, সঙ্গে নির্দেশক গৌতম সরকার।

একটা সাদা ক্যানভাস ঘিরে নাটক। এই সাদা ক্যানভাসই নাকি বিখ্যাত শিল্পীর অন্যতম সৃষ্টি! ভীষণ দামি! এখানে দামই নির্ধারণ করছে শিল্পের উৎকর্ষতা। বাজার অর্থনীতিতে শিল্পীর সৃষ্টি ও একটি পণ্য মাত্র! ঋষেল, মৈনাক আর অনুভব, এই তিন ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মধ্যে সংঘাতের নানা মুহূর্ত তৈরি হয় আপাত সাদা ক্যানভাস নিয়ে। চিত্রকলার পৃষ্ঠপোষক ঋষেল এই  Painting (সাদাক্যানভাস)টি কেনে দশ লক্ষ টাকায়। তার ধারণা এটি একটি মহাঘ্য আর্ট, যদিও মৈনাক মনে করে এটা কোন শিল্পই নয়, এটা একটা সম্পূর্ণ সাদা ক্যানভাস। আবার অনুভব বলে ক্যানভাসটা আপাত দৃষ্টিতে সাদা মনে হলেও আসলে সাদা নয়, বিশেষ কিছু একটা আছে যেটা ঠিক ধরা যাচ্ছেনা; অর্থাৎ সে দুদিক বজায় রাখার চেষ্টা করে।নাটকটির নাম Art হলেও এটি মূলত আবর্তিত হয় তিন বন্ধুর পারস্পরিক সম্পর্কের রসায়ন ঘিরে।

নাটকের তিনটি চরিত্র এখানে সমাজের তিন ধরণের (স্তরের) মানুষের প্রতিনিধি স্বরূপ। ঋষেল, যে অর্থনৈতিক ভাবে স্বচ্ছল ও সমাজের উচ্চস্তরে (এলিট) অবস্থান করে, শিল্পের বোধতার অনায়ত্ত, ফলে শিল্পের পৃষ্ঠপোষক হয়ে নিজেকে শিল্পবোদ্ধা হিসেবে জাহির করার চেষ্টার পাশাপাশিসে একটা সাদা ক্যানভাস বহুমূল্যে কিনে সেটিকে মহান শিল্প হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। মৈনাক বাস্তব চিন্তার স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ, সেতার মনের ভাবকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে পারে। তাই সে ঋষেলকে বোঝাতে চায় যে বহুমূল্যেকে নাহলে ও সাদা ক্যানভাসটি আসলে কোন মহানশিল্প সৃষ্টি নয়, শুধুমাত্র আর্থিক মূল্যের নিরিখে কোন কিছু শিল্পহয়ে উঠতে পারেনা। ঋষেলযে কাজটা ভুল করেছে সেটা যুক্তি দিয়ে বোঝাতে চায়।অন্যের ভুলকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেবার প্রবণ তার মধ্যে দিয়ে মৈনাকের চরিত্রে মধ্যবিত্ত সবজান্তা ভাবটি ফুটে ওঠে। আবার, লড়াই করে বেঁচে থাকা মানুষের অবস্থান থেকে অনুভব চরিত্রটির কাছে ঋষেলের শিল্প নিয়ে মাতামাতি বা মৈনাকের ঋষেলকে নিয়ে চিন্তা, কোন কিছুই বিশেষ প্রভাব ফেলেনা। প্রতিনিয়ত নিজেকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করার লড়াই তাকে কিছুটা নিলিপ্ত করে দিয়েছে। এই ভাবে তিনটি চরিত্রের মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন অবস্থানের ছবি সুন্দরভাবে প্রতিফলিত হয়।

Previous Kaahon Theatre Review:

তিনবন্ধুর মধ্যে এক অদ্ভুত দৃঢ়বন্ধন লক্ষ্য করা যায়। তিন পুরুষমানুষের তৈরি এক পরিসর যেখানে আর কারোর প্রবেশাধিকার নেই, তাদের কিছু অত্যন্ত ব্যক্তিগত অনুভূতি শুধুমাত্র এই পরিসরেই বিনিময় করতে পারে। হাসিকান্না, সুখদুঃখ, ঝগড়া, মান, অভিমান, ভালোবাসা, সবকিছু বিনিময় হয় ছোট্ট এই পরিসরেই। নাটকে দেখতে পাই একটা সাদা ক্যানভাসকে উপলক্ষ্য করে তিনজনের পারস্পরিক সংঘাত চরমে ওঠে। একে অপরকে আঘাত করে, যন্ত্রণা দেয়, মানসিক ভাবে ক্ষতবিক্ষত করে, এমনকি একে অন্যের কাছের মানুষদের ও আক্রমণ করতেও দ্বিধা করেনা। এভাবে বন্ধুত্বের দৃঢ় সম্পর্কটার প্রতি আস্থা হারিয়ে যায়, তাদের বিচ্ছেদ আসন্ন বলে মনে হয়। বন্ধুত্বের সম্পর্কের বাইরে গিয়ে যদি বৃহত্তর সমাজের প্রেক্ষিতে দেখি তাহলে এক অস্থির সময়ের ছবি দেখতে পাই, যেখানে বিরুদ্ধমত সহ্য না করতে পারার অসহিষ্ণুতা লক্ষ্য করা যায়, বর্তমান সময়ে যা বেশ প্রাসঙ্গিক। কিন্তু শেষে দেখতে পাই তারা আবার কাছাকাছি চলে আসে। বন্ধুত্বের এই পরিসরে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ও দৃঢ়বন্ধন (male bonding) সমাজের প্রেক্ষিতে খুবই তাৎপর্য্যপূর্ণ!

একই নাটক যখন প্রসেনিয়াম ও অন্তরঙ্গ স্পেসে অভিনীত হয় তখন দুটোর মধ্য তুলনা চলেই আসে স্বাভাবিকভাবে। প্রথমে অন্তরঙ্গ স্পেসে অভিনয় প্রসঙ্গে আসা যাক। এই ধরণের উপস্থাপনার মূলকথা হল দর্শক ও অভিনেতাদের মধ্যে দূরত্ব বা সীমারেখা ঘুচিয়ে ফেলে এক অন্তরঙ্গ পরিবেশ সৃষ্টি করা।আর্টগ্যালারীর অন্তরঙ্গ স্পেসে এবং একাডেমি মঞ্চে নাটকটির দুটি পৃথক উপস্থাপনা দেখার পর বলাই যায় যে মঞ্চের উপস্থাপনাটি সামগ্রিক সুন্দর পরিবেশনার গুণে সহজেই দর্শকের মনগ্রাহী হয়ে ওঠে, তবে অন্তরঙ্গ স্পেসের উপস্থাপনা মনকে তেমন স্পর্শ করতে পারেনি। অন্তরঙ্গ স্পেসে অভিনয়ের ক্ষেত্রে মঞ্চের সঙ্গে বিশেষ করে কোন তফাত লক্ষ্য করা গেল না, ফলে কোন কোন সময় অভিনয় একটু উচ্চকিত লাগে যা এ ধরণের স্পেসে কখনই কাম্য নয়। একেবারে সামনে, একই তলে, একই আলোক বৃত্তে অভিনেতা ও দর্শক অবস্থান করা সত্ত্বেও দর্শকদের সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে অভিনেতারা অভিনয় করে চলেন প্রসেনিয়ামের অভ্যাস মেনে! দর্শকদের সাথে নাটকের নিবিড় ও প্রত্যক্ষ যোগাযোগের জন্য দর্শকদের সাথে দৃষ্টিবিনিময়  করে অভিনয় করা এইধরণের থিয়েটারের মূলঅস্ত্র, কিন্তু তার প্রয়োগ একবার ও চোখে পড়ল না।দর্শকদের স্থির বসিয়ে রেখে অভিনেতারা নাটকের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ নিয়ে নেয়, ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়ায় প্রসেনিয়ামে দেখার মতোই অভিজ্ঞতা। অবশ্য সেটা সচেতন ভাবেই করা হয়ে থাকতে পারে। অভিনেতারা কখনও খুব কাছে চলে আসে কখনও দূরে, কখনও মুখোমুখি কখনও পিছনে, কখনও একজনের অভিনয় দেখতে গিয়ে অন্যদের রিএকশন মিস হয়ে যায়। কোন না কোন সময় দর্শকদের এই সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, মনে হতে থাকে স্থান পরির্তন করতে পারলে ভালো হয়, সর্বদা একটা অস্বস্তি কাজ করতে থাকে, নাটকের সাথে একাত্ম হবার সুযোগই মেলেনা। দর্শকাসনও অভিনয় স্থানের বিন্যাসের ব্যাপারে একটু ভেবে দেখার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়।

নাটকটির মঞ্চ উপস্থাপনা কিন্তু বেশ নজর কাড়ে। একটি শক্তিশালী text’কে নির্দেশক দক্ষতার সাথে সফল ভাবে নাট্যে উত্তরণ ঘটিয়েছেন। এক ঘন্টা পঁচিশ মিনিটের নাটকটিতে আলাদা করে দৃশ্য বিভাজন নেই, ফলে নাট্য চলনের টানটান ভাবটি শেষ অবধি বজায় থাকে। মূলত সংলাপনির্ভর নাটক, কিন্তু অভিনেতাদের অভিনয় গুণে কখনই কথায় ভারাক্রান্ত বলে মনে হয়না। অনির্বান চক্রবর্তীর অসাধারণ সময়জ্ঞান (timing), সত্রাজিত সরকারের বাচিক অভিনয় (vocal) এবং গৌতম সরকারের অভিব্যক্তি (reaction) প্রযোজনাটিকে এক বিশেষ উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। নির্দেশকের সুচিন্তিত ভাবনা প্রযোজনাটিতে বেশ লক্ষ্য করা যায়, তিনি পুরো মঞ্চটি ব্যবহার করছেন সুপরিকল্পিত কম্পোজিশনের ভাবনা দিয়ে। অনুভব চরিত্রে অনির্বান চক্রবর্তীর বুদ্ধিদীপ্ত অথচ সরল ও সাবলীল অভিনয় এই নাটকের বিশেষ সম্পদ। সত্রাজিত সরকারের বাচিক ও শারীরিক অভিনয় মৈনাক চরিত্রের সাথে দারুণ মানিয়ে যায়। গৌতম সরকারের ঈষৎ স্থিমিত অভিনয়ে ঋষেল চরিত্রটি বাস্তব রূপ পায়। মঞ্চ, আলো, পোশাক ও রূপসজ্জার সামগ্রিক সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়। অন্তরঙ্গ স্পেসে অভিনয়ের সময় মেক্আপ বা বিশেষ পোশাকের ব্যবহার হয় না, তবে মঞ্চাভিনয়ে প্রয়োজনীয় মেক্আপ এবং চরিত্রানুসারে পোশাক-পরিকল্পনা করা হয়েছে। মঞ্চাভিনয়ে এই দুয়ের গুরুত্ব কতটা, নাটকটা দুজায়গায় দেখলে সহজেই বোধগম্য হয়।

হিরন মিত্রের শিল্প ভাবনা নাটককে সমৃদ্ধ করে। মঞ্চে অল্প কিছু উপকরন ব্যবহার করে নাট্য উপযোগী পরিবেশ তৈরী করেছেন তিনি। তিনটি চেয়ার, একটি ফাঁকাফ্রেম, দুটি স্ট্যান্ডফ্রেম, একটি চৌকোর স্ট্রাম ও একটি লম্বা স্ট্যান্ডের উপর মাছের বৌল (fish bowl) – সাদা ও কালো ছাড়া অন্য কোন রং-এর ব্যবহার নেই! তিন বন্ধুর নিজস্ব পরিসরে যন্ত্রণা, রাগ, অভিমান, সুখ-দুঃখ নিয়ে ছটফটানির সঙ্গে মঞ্চে থাকা বৌলের মধ্যে মাছের নড়াচড়া, প্রতীক হিসাবে দারুণভাবে মিলে যায়। সামান্য উপকরণ দিয়ে মঞ্চকে অর্থপূর্ণ করে তোলার এরকম নিদর্শণ আমরা ওনার কাছ থেকে এর আগেও বারবার পেয়েছি।

আর্ট গ্যালারীতে পুরো নাটকে আলো একই ভাবে উজ্জ্বল থাকে। মঞ্চে প্রথমে উজ্জ্বল সাদা আলো থাকে এবং ক্রমে নাটকের মুড পরিবর্তনের সাথে আলো কিছুটা কমে বাড়ে, তবে আলোর বিশেষ কারিগরি করার চেষ্টা হয়নি, যা নাটকের পক্ষে প্রয়োজনীয় মনে হয়েছে। নাটকের মাঝ সময় থেকে শেষপর্যন্ত একটা বেগুনী আলো থেকে যায় তার তাৎপর্য্য অবশ্য বোঝা গেল না।

দুটি স্পেসেই music এর কোন ব্যবহার নেই, তবুও  কখনই তার কোন অভাব বোধ করে না দর্শকরা, কারণ নাটকের মধ্যে একটা অন্তলীন আবহ রয়েছে যা দর্শক তার নিজের মতো করে শুনতে পান।তবুও বলবমঞ্চ-উপস্থাপনায় কিছু জায়গায় music ব্যবহার করলে মন্দ হত না।

সব মিলিয়ে বলা যায় নাটকটি মঞ্চে যতটা সফল, অন্তরঙ্গ স্পেসে দর্শকদের মন সেভাবে ছুঁতে পারেনি। কারণ হিসাবে মনে হয় অন্তরঙ্গ স্পেসের রীতিকে অনেকাংশে উপেক্ষা করা! অন্তরঙ্গ স্পেসের ছক ভেঙ্গে নতুন পরিসর তৈরীর যে খেলায় নির্দেশক দর্শকদের সাথে মাতলেন তাতে দর্শকরা কিছুটা উপভোগ করলেন কিন্তু অনুভবে প্রবেশ করল না, একাত্ম হওয়া গেল না। তবে থিয়েটারকে গতিশীল রাখার জন্য থিয়েটারের নানাদিক নিয়ে এরকম পরীক্ষা নিরীক্ষা সর্বদা প্রয়োজন। এরমধ্য দিয়েই হয়ত ভবিষ্যতে উন্মোচিত হবে থিয়েটারের নতুন দিগন্ত। তাই কলকাতা প্র্যাক্সিস ও গৌতমের প্রয়াসকে সাধুবাদ জানাই।

Pradip Datta
A post-graduation diploma holder of the Department of Media Studies, University of Calcutta, he has been a theatre activist in Bengal for the last twenty five years. He is a freelance journalist by profession. Besides theatre, his passion includes recitation, audio plays and many more.

Read this review in English.

ইংরেজিতে পড়তে ক্লিক করুন।

Related Updates

Comments

Follow Us

Show Calendar

Message Us